জাতীয়

১৮ জুলাই: রক্তক্ষয়, সংঘর্ষ আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সেই দিন

আপডেট: জুলা ১৮, ২০২৬ : ০৬:০৬ এএম ১২
১৮ জুলাই: রক্তক্ষয়, সংঘর্ষ আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সেই দিন

আজ ১৮ জুলাই। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

দিনের শেষে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হলে কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। ১৭ জুলাই রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরদিন সকাল থেকে রাজধানীর উত্তরা, মহাখালী, মিরপুর, ধানমন্ডি, রামপুরা, বাড্ডা, প্রগতি সরণি ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। উত্তরা ছিল সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

সেদিন উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আন্দোলনকারীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। একই দিনে ধানমন্ডিতে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ এবং যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক মেহেদি হাসান নিহত হন। তাঁদের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, সেতু ভবন, পুলিশ বক্স এবং বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাসে আগুনের ধোঁয়া মেট্রোরেলের লাইনে ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

আন্দোলন দ্রুত রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম, নরসিংদী, সাভার, রংপুর, সিলেট, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সূত্রে ওই দিন নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য এলেও বহু মানুষের প্রাণহানি ও দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

সন্ধ্যার পর রাজধানীর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই দিন রাত ৯টার পর দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে মোবাইল ইন্টারনেটও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে যায়। পরবর্তী কয়েক দিন ধরে চলা এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সেদিনই সরকার কোটা সংস্কারের বিষয়ে নীতিগতভাবে এগোনোর আগ্রহ প্রকাশ করে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও কোটা কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবের কথা জানান। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, প্রাণহানির ঘটনার মধ্যে সংলাপ সম্ভব নয়।

১৮ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু ওই দিনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রাণহানি, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয় এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!