তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নেওয়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
একই সঙ্গে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল তৈরি পোশাকের বাইরে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি করা।
প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, বরং শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)। এ কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স, উৎপাদন আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং নতুন বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন এসেছে, যা অতিরিক্ত বিনিয়োগে উৎসাহ জুগিয়েছে।
ইসিফরজে প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বেড়েছে ৫৯ শতাংশ, যেখানে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগীদের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ শতাংশে। তাদের গড় রপ্তানিও বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।
প্রকল্পের আওতায় ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জ ও চট্টগ্রামে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিভিত্তিক দুটি নতুন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নের কাজও শেষ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স–সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে, যাদের ৩৮ শতাংশ নারী। সংস্থাটির হিসাবে, সামগ্রিকভাবে এ উদ্যোগে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় তিন গুণ।
বিশ্বব্যাংক তাদের মূল্যায়নে বলেছে, রপ্তানি বহুমুখীকরণে সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের একটি সফল উদাহরণ হলো ইসিফরজে প্রকল্প। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটির মতে, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর তদারকির সমন্বিত প্রয়োগই এ সাফল্যের মূল ভিত্তি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!