জাতীয়

মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

আপডেট: আগ ০৮, ২০২৬ : ০৫:২৬ এএম
মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল জনগণের যুদ্ধ এবং গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম—এমন মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

তিনি বলেন, জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের অনেক ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আজ শুক্রবার ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস’-এর ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জীবন উৎসর্গ করে দেশ স্বাধীন করেছেন।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘আর কোনো স্বৈরশাসন নয়’

দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তাঁর ভাষ্য, সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা উচিত নয়।

মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অনেক তরুণ শারীরিক যোগ্যতার কারণে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেলে কান্নায় ভেঙে পড়তেন এবং যুদ্ধ করার সুযোগ পাওয়ার জন্য আকুতি জানাতেন।

ভোটের রায় উপেক্ষা করায় মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ওই নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের সেই রায়কে সম্মান করেনি।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন শুরু করলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের নেতৃত্ব ও আহ্বানে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এসব ঘটনা সঠিকভাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে।

জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ

বক্তব্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য যুদ্ধ করেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন ও মা-বোনের সম্মান রক্ষায় তাঁরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি মন্তব্য করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান করেছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে খালেদা জিয়ার বন্দিত্বের কথাও স্মরণ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বক্তব্য দেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

এর আগে সন্ধ্যা ৮টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। পরে সংগঠনের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরান হামিদুর রহমান উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!