দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ইউএনওদের সঙ্গে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ এ তথ্য জানান।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানুষের সেবা করার সুযোগ একটি বড় আমানত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ইউএনওদের মাঠ প্রশাসনে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনরত উপজেলা নিজের উপজেলা না হলেও সেটি বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বসবাসকারী মানুষও নিজের এলাকার মানুষের মতোই আপন। তাই দেশের প্রতিটি মানুষকে নিজের মানুষ মনে করে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু আইন করে সমাজের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। মানুষকে বোঝানো ও সচেতন করার মাধ্যমেও অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। এ জন্য নিজ নিজ এলাকায় জনসচেতনতা তৈরিতে ইউএনওদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান
পরিবেশ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দূষণের দিক থেকে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে মানুষকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিলে একজন ব্যক্তি ১০টির পরিবর্তে ৫০টি গাছ লাগাতে উৎসাহিত হতে পারেন। এভাবে পরিবেশ রক্ষায় বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব।
খেলাধুলার প্রসারেও ইউএনওদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে উৎসাহিত করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে নিয়ম ও শৃঙ্খলাবোধ তৈরি হয়।
জাতীয় দিবসের অপেক্ষা না করে স্থানীয় বিভিন্ন উপলক্ষে খেলাধুলার আয়োজনের পরামর্শ দেন তিনি।
মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার তাগিদ
সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে দয়া-মায়া কমে যাচ্ছে এবং মানুষ দিন দিন নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে সামাজিক শান্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মানুষের প্রতি মানুষের দরদ ও সহমর্মিতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে।
শুধু মানুষের জন্য নয়, পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতিও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিকতা এবং পশুপাখির প্রতি মায়া-মমতার বিষয়গুলো পাঠ্য হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে যে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা একসময় দেওয়া হতো, তা ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
খাল খননে ইউএনওদের প্রশংসা
বিভিন্ন উপজেলায় খাল খনন প্রকল্পের কাজ সততার সঙ্গে সম্পন্ন করে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ায় ইউএনওদের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আপনারা সরকার এবং জনগণের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাতে আমার বিশ্বাস, আপনারা জনগণের জন্য অনেক ভালো কিছুই করতে পারবেন।’
সভায় ইউএনওরা নিজ নিজ উপজেলায় খাল খননের ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, খাল খননের আগে যেসব এলাকায় বছরে দুই ফসল হতো, সেখানে এখন তিন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। খাল পুনঃখননের ফলে পানি নিষ্কাশন, সেচব্যবস্থা ও কৃষিকাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
উপকারভোগীদের পক্ষ থেকে পাঠানো ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার বার্তাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন ইউএনওরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল খননের মূল উদ্দেশ্য হলো নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিত্র ফিরিয়ে আনা। পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সভায় খাল খনন প্রকল্পে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া ৮৩ জন ইউএনওসহ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!