জাতীয়

প্রতিটি জেলায় আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

আপডেট: আগ ১৫, ২০২৬ : ০৪:৪০ এএম ১৩
প্রতিটি জেলায় আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে দেশের প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইতিমধ্যে দেশের ১৩টি মিট প্রসেসিং সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলায় এ ধরনের আধুনিক কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র চালু হলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে মাংস প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।

‘অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খাতটি পুনর্গঠনে কাজ করছে।

তিনি বলেন, গত ১৮০ দিনে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না।

নিরাপদ খাদ্যে উৎপাদন পর্যায় থেকেই নজর

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদনের শুরু থেকেই গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মাটির গুণগত মান পরীক্ষা, নিরাপদ পশুখাদ্য নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খামারিদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদনকারী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

গোয়াল ফার্ম পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ

দীর্ঘদিনের অবহেলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গোয়াল ফার্ম প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। এটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ইতিমধ্যে ফার্মটি পরিদর্শন করা হয়েছে এবং গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পবিত্র রমজানে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে মাংস, দুধ, ডিমসহ বিভিন্ন প্রাণিজ পণ্য সরবরাহে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি। রাজধানীর ৩৬টি স্থানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করা হয়।

কোরবানিতে দেশীয় পশুতে জোর

এবারের কোরবানিতে দেশীয় গবাদিপশুর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল বলে জানান সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

এর ফলে দেশীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন এবং ক্রেতারাও সহনীয় দামে কোরবানির পশু কিনতে পেরেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারের হিসাবে, এবার প্রায় ৯৮ লাখ দেশীয় গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে।

দেশেই তৈরি হচ্ছে ভ্যাকসিন

প্রাণিসম্পদ গবেষণায়ও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) সম্প্রতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে। ভ্যাকসিন দুটি ইতিমধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে এসব ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।

আধুনিক হচ্ছে জাতীয় চিড়িয়াখানা

জাতীয় চিড়িয়াখানাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। চিড়িয়াখানার পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা ও প্রাণী সংগ্রহে ইতিমধ্যে উন্নতি হয়েছে। দর্শনার্থীর সংখ্যাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ থেকে এক লাখ ৯০ হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করেছেন বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি চিড়িয়াখানায় চারটি নতুন প্রাণী সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের তিনটি শাবক জন্ম নিয়েছে। তাদের বয়স এখন চার মাস।

রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশালে নতুন চিড়িয়াখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন ও প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। নতুন সাফারি পার্ক স্থাপনের বিষয়েও কাজ চলছে।

উন্নত পশুখাদ্য ঘাসের চাষ

অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল একটি পশুখাদ্য ঘাস দেশে আনা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। ইতিমধ্যে প্রায় ৮৫০ জন খামারিকে এ ঘাসের চাষাবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এ ঘাস ব্যবহারের ফলে পশুর খাদ্য ব্যয় কমবে, দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়বে এবং পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে। ভবিষ্যতে এর ফলে গরুর মাংসের দামও কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জাটকা সংরক্ষণে সহায়তা

মৎস্য খাতের বিষয়ে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।

মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সহায়তায় ২৪ কোটিরও বেশি টাকার বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন এবং জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই খাতে পরিণত করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, খামারিদের আয় বাড়ানো, মাংস ও দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত প্রাণিজ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!