কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তিনি বলেছেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে যথাযথ সম্মতি এবং সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘এআই অ্যান্ড গভর্ন্যান্স: গ্লোবাল টেকনোলজি আর্কিটেকচার, ন্যাশনাল ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড পলিসি ডিরেকটিভস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এটি জাতীয় সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। জনগণের সম্মতি, সচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে এআই গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে হবে।
জনপ্রশাসনে এআই ব্যবহারের ওপর জোর
জনপ্রশাসনে এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের এআই রূপান্তরের প্রথম বড় ক্ষেত্র হওয়া উচিত জনপ্রশাসন। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কোনো তথ্যের জন্য একজন কর্মকর্তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফাইল খুঁজতে বা অন্য দপ্তরে যোগাযোগ করতে হবে না।
তিনি বলেন, অনুমোদিত সরকারি তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে এআই সহকারী সংশ্লিষ্ট বিধি, পরিপত্র, আগের সিদ্ধান্ত ও তথ্যের উৎসসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এতে কর্মকর্তাদের সময় সাশ্রয় হবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে এবং সরকারি সেবার দক্ষতা বাড়বে।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, সরকারি ব্যয়, ক্রয়, নিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ও ফাইল ব্যবস্থাপনাসহ জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগ প্রকল্প প্রণয়ন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই এবং প্রকল্প পর্যবেক্ষণে এআই ব্যবহার করলে সময় ও সরকারি অর্থের অপচয় কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করতেও এআই ব্যবহারের কথা বলেন তিনি।
তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা
এআই ব্যবহারে তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এআই ব্যবস্থায় কোন তথ্য কতটুকু এবং কোন স্তরে ব্যবহার বা শেয়ার করা যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রতারণার ঝুঁকি মোকাবিলায় জনসচেতনতার পাশাপাশি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তবে আইন, নীতিমালা, নিরাপত্তা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের কল্যাণে সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব।
‘এআই-সহায়ক সরকার, মানুষবিহীন সরকার নয়’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে উল্লেখ করে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, অদক্ষতা শুধু কর্মসংস্থান রক্ষার জন্য ধরে রাখা উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘এআই-সহায়ক সরকার, মানুষবিহীন সরকার নয়’।
প্রযুক্তির সঙ্গে কর্মসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রেখে গ্রহণযোগ্য ও জনকল্যাণমুখী সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।
এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বোঝাতে তিনি বলেন, একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে যেমন রান্না করা যায়, তেমনি একটি ঘরও পুড়িয়ে দেওয়া যায়। এআইও তেমন—এটি সরকারি সেবার মান বাড়াতে পারে, আবার নতুন ঝুঁকি ও বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী হতে হবে।
জাতীয় নিরাপত্তায়ও বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার
এআইয়ের প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও দ্রুত বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও নির্ভুল অভিযানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে বলে জানান তিনি।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্য ও অ্যালগরিদম যেসব দেশ নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতে কৌশলগত ভারসাম্যে তারাই বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
ভারত-চীন সীমান্তের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৈন্যের পরিবর্তে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নজরদারিতে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এআই, রোবোটিক্স ও অপটিক্যাল প্রযুক্তি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছে।
সেমিনারে যা আলোচনা হলো
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসম রিদওয়ানুর রহমান সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি এবং আইসিটি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট আশফাক জামানও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনা শেষে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনায় এআইয়ের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়নে স্থানীয় চাহিদার ভূমিকা এবং সাইবার কার্যক্রম ও আধুনিক যুদ্ধে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীর সভাপতিত্বে সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
No comments yet. Be the first to comment!