মঈন মাহমুদ
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইন্টারন্যাশাল হার্ট ফেলিউর কনফারেন্স ২০২৬। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আজ অনুষ্ঠিত হলো প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে মেডিকেল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কার্ডিয়াক ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (কার্ডিয়াক এমআরআই), এন্ডোমায়োকার্ডিয়াল বায়োপসির এর আধুনিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এই-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিকস এবং উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা জানান, এআই প্রযুক্তি হার্ট ফেইলিউর দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক নির্ণয় এবং রোগীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কার্ডিয়াক এমআরআই হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা নির্ভুলভাবে মূল্যায়নে স্বর্ণমান হিসেবে বিবেচিত। ওয়ার্কশপে দেশি-বিদেশি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি বাংলাদেশে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এআই ও আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির সমন্বয় দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
প্রি-কনফারেন্সের উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বিএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন। এআই বেইসড মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট এর উপর বিস্তারিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়ার ডিজিটাল হেলথ এক্সপার্ট ডা. সুলতান কাভেরি। আরো বক্তব্য রাখেন এভায়কেয়ার হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মোঃ আতাহার আলী। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কার্ডিয়াক এমআরআই ওয়ার্কসপে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউর কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মনজুর মাহমুদ। ভাইস-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাফর ইকবাল জামালী। এতে প্যানেলিস্ট ছিলেন সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি হসপিটাল জুরিচ এর অধ্যাপক ডা. রোবার্ট মানকা, বিএমইউর হার্ট ফেলিউর ডিভিশনের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. দীনে মুজাহীদ মোঃ ফারুক ওসমানী, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাহিদুল হক। অনুষ্ঠানে বিএমইউ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, নিওন্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল মান্নান প্রমুখ ছাড়াও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞগণ উপস্থিত ছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্কশপটি একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ডিজাইন করা হয়, যেখানে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন এবং ব্যবহারিক সেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেখানে এইআই-সহায়ক কার্ডিয়াক ইমেজিং ব্যাখ্যা, কার্ডিয়াক এমআরআই সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি কার্যপ্রবাহে এআই টুলের সংযুক্তি, হার্ট ফেইলিউর নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় কেস-ভিত্তিক আলোচনা করা হয়। এই সেশনগুলোর লক্ষ্য ছিল উদীয়মান প্রযুক্তি এবং বাস্তব ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমানো, যা হার্ট ফেইলিউর চিকিৎসার উন্নয়নের কনফারেন্স থিমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে, যা রোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্ণয় ও প্রগনোসিস পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সহায়তা করছে। এআই সিস্টেমগুলো দ্রুত বৃহৎ ডেটাসেট বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বিশেষ করে জটিল ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। তবে অধিকাংশ এআই টুল এখনও উন্নয়ন বা প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাপক ব্যবহারের আগে এগুলোর যাচাই প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, কার্ডিয়াক এমআরআই উচ্চ রেজোলিউশনের, নন-ইনভেসিভ ইমেজিং প্রদান করে এবং এতে কোনো রেডিয়েশন এক্সপোজার নেই, যা হার্ট ফেইলিউর রোগীদের সঠিক নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্কশপে এআই এবং কার্ডিয়াক এমআরআই-এর যৌথ ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কার্ডিয়াক স্ট্রাকচারের স্বয়ংক্রিয় সেগমেন্টেশন, দ্রুত ইমেজ প্রসেসিং ও রিপোর্টিং, ভেন্ট্রিকুলার ফাংশনের পরিমাণগত মূল্যায়ন, সূক্ষ্ম মায়োকার্ডিয়াল অস্বাভাবিকতা সনাক্তকরণে ভূমিকা রাখে। এই সমন্বয় দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং পর্যবেক্ষকভেদে পার্থক্য কমায়, ফলে উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং আরও সহজলভ্য ও কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য সফল বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং সেন্টার স্থাপন, এমআরআই-সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্ডিয়াক সফটওয়্যার ও এআই টুলের প্রাপ্যতা, নির্ভরযোগ্য ডেটা সংরক্ষণ ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা; প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ নিশ্চিত করা, ব্যয় কমানো, নিয়ন্ত্রক ও নৈতিক কাঠামো যেমন স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের জন্য মানসম্মত নির্দেশিকা, ডেটা গোপনীয়তা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এআই টুলের যাচাই, গবেষণা ও স্থানীয় ডেটার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপটি বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর কার্ডিওলজির একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। মেডিকেল অও এবং কার্ডিয়াক এমআরআই-এর সমন্বয় হার্ট ফেইলিউরের প্রাথমিক নির্ণয়, ঝুঁকি নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিগুলোকে নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ব্যবহারে রূপান্তর করতে হলে বাংলাদেশকে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে। যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিগুলো দেশের কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসার মান ও রোগীর ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে সক্ষম।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!