বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্পেকস ২০৩০ (SPECS 2030) উদ্যোগ। দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও জনকেন্দ্রিক চক্ষুসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্যোগটির বাংলাদেশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার উপজেলা পর্যায়ে নির্মাণাধীন ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত চক্ষুসেবা চালুর পরিকল্পনা করছে। এসব হাসপাতালে চক্ষুরোগীদের জন্য বিশেষায়িত বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ এবং অপারেশন থিয়েটারের সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার একটি সমন্বিত জাতীয় চক্ষুসেবা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। এর আওতায় প্রায় ১০ লাখ ছানি অস্ত্রোপচার, কয়েক কোটি চশমা বিতরণ এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। ডা. মুহিত বলেন, “আমরা আধুনিক চক্ষুসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তাঁর ভাষ্য, দেশের প্রায় ৫০০ উপজেলা উন্নত চক্ষুসেবার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় ছুটতে হবে না। স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণে প্রাথমিক চক্ষুসেবা অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদ্যমান জেলা হাসপাতালের অবকাঠামো ব্যবহার করে দেশের অন্তত অর্ধেক জেলায় নিয়মিত ছানি অস্ত্রোপচার ও রিফ্র্যাক্টিভ এরর বা প্রতিসরণ ত্রুটি সংশোধনের সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ডা. মুহিত বলেন, গত ছয় মাস ধরে চক্ষুসেবা শক্তিশালী ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে দেশের চক্ষুসেবা খাতে “একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক পরিবর্তন” আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
রিফ্র্যাক্টিভ এরর চিকিৎসায় জোর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পেকস ২০৩০ উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী চালু হয় ২০২৪ সালের মে মাসে। এর মূল লক্ষ্য হলো রিফ্র্যাক্টিভ এরর–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় চক্ষুসেবা মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। চোখের পাওয়ারের সমস্যার কারণে ঝাপসা দেখা, দূরের বা কাছের বস্তু স্পষ্ট না দেখা—এসব সমস্যা রিফ্র্যাক্টিভ এররের অন্তর্ভুক্ত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে চক্ষুসেবার বিদ্যমান ঘাটতি দূর করতে শুধু বিশেষায়িত হাসপাতাল বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে চক্ষুসেবাকে যুক্ত করা, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, সাশ্রয়ী মূল্যে চশমার সরবরাহ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এ জন্য সরকার, ডব্লিউএইচও, এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে স্পেকস ২০৩০-এর জাতীয় পর্যায়ের সূচনা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একত্র করার ক্ষেত্রে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত চক্ষুসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং রিফ্র্যাক্টিভ এররের চিকিৎসার আওতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি শিশুদের জন্য স্কুলভিত্তিক দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও সহজলভ্য চশমার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি শ্রমিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য চক্ষুসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই চক্ষুসেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক ইউনিটের প্রধান ও আঞ্চলিক উপদেষ্টা ড. তাশি তোবগে স্পেকস ২০৩০-এর বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে একটি উপস্থাপনা দেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এএসএমএম কাদির এবং বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ। উদ্বোধনের পর বাংলাদেশে স্পেকস ২০৩০ বাস্তবায়নের মাধ্যমে চক্ষুসেবা শক্তিশালী করার বিষয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের (আইএপিবি) বাংলাদেশ শাখার অনারারি কান্ট্রি চেয়ার ডা. মুনির আহমেদ আলোচনা পরিচালনা করেন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন, বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়াল, আইএপিবির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল অফিসার ইন্দ্র প্রসাদ শর্মা এবং সিএসএফ গ্লোবালের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম জুয়েল।
আলোচনায় কর্মক্ষেত্রে চক্ষুস্বাস্থ্য, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, সাশ্রয়ী মূল্যে চশমা সরবরাহ এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
পাঁচ কৌশলগত স্তম্ভ স্পেকস ২০৩০ পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মাধ্যমে রিফ্র্যাক্টিভ এরর–সংক্রান্ত সেবার পরিধি বাড়াতে সরকার, পেশাজীবী সংগঠন, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগটির বাস্তবায়ন হলে চক্ষুসেবার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে চোখের সমস্যার প্রাথমিক শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও রেফারেলের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে অনেক রোগীকে জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে। স্পেকস ২০৩০ জাতীয় পর্যায়ে এসব কার্যক্রম সমন্বয়ের পাশাপাশি ২০৩০ সালের বৈশ্বিক চক্ষুসেবা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের একটি বাস্তবায়ন কাঠামো ও কর্মপন্থা তৈরিতে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!