রাজধানীর যানজট কমাতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করে নির্দিষ্ট এলাকার রিকশা ওই এলাকার মধ্যেই চলাচল করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দিন ও সড়কভিত্তিক চলাচলের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম সম্প্রতি নগর ভবনে বাসসকে এসব কথা জানিয়েছেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘ঢাকা শহরকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে নির্দিষ্ট এলাকার রিকশা ওই এলাকার মধ্যেই চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। এক এলাকার রিকশা অন্য এলাকায় গিয়ে যাতে যানজট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী দিন ও সড়কভিত্তিক চলাচলের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।’
‘ডেমরার রিকশা নিউ মার্কেটে যেতে পারবে না’
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা এদিক-সেদিক ও উল্টো পথে চলাচল করছে বলে জানান আব্দুস সালাম। চালকদের অনেকে ট্রাফিক আইন ও চলাচলের শৃঙ্খলা না মানায় যানজট আরও বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রিকশা চলাচলের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ডেমরার একটা রিকশা কোনোভাবেই নিউ মার্কেটে যেতে পারবে না। অঞ্চলভিত্তিক আমরা ভাগ করে দেব। ভাগ করে দিয়ে তাদের হয়তো দিনও ভাগ করে দেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কিছু রাস্তা ভাগ করে দেব, কিছু কিছু রাস্তায় যাতে তারা একেবারেই চলাচল করতে না পারে—সেই জায়গাটা ঠিক করে দেব।’
লাইসেন্স ছাড়া কেউ ঢাকায় রিকশা চালাতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, কেরানীগঞ্জ বা ডেমরা থেকে রিকশা নিয়ে এসে অন্য এলাকায় নির্বিচারে চলাচলের সুযোগ থাকবে না। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার রিকশাও দক্ষিণ সিটির এলাকায় ইচ্ছেমতো চলতে পারবে না।
রিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ
রিকশা ব্যবস্থাপনাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ডিএসসিসি প্রশাসক।
তিনি বলেন, বন্যা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসছেন। তাঁদের কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ ভ্যান নিয়ে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। এভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঢাকামুখী মানুষের চাপ নগরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
আব্দুস সালাম বলেন, ‘সারা বাংলাদেশের মানুষকে কি আমরা ঢাকা শহরে জায়গা দিতে পারব? এটাও তো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
তিনি জানান, গত ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকায় প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে। এসব রিকশাকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, অঞ্চলভিত্তিক রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আইন প্রণয়ন করে সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানোর পর তা বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে আমরা এই বিষয়টিকে একটি পদ্ধতির মধ্যে আনতে চাই। সেটার জন্য তো কিছুটা সময় লাগবে এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যমসহ সকলের সহযোগিতা চাই।’
বাস চলাচলেও শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ
রিকশার পাশাপাশি রাজধানীর বাস চলাচলেও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান আব্দুস সালাম। যত্রতত্র বাস থামানো এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘যত্রতত্র যাতে বাস থামাতে না পারে, যত্রতত্র যেখান-সেখান থেকে যাতে যাত্রী উঠাতে না পারে—এটাও একটা সিস্টেমে আনতে হবে।’
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের কিছু সময় দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবহন ব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কাজ চলছে। কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ই-রিকশার জন্য নীতিমালা হচ্ছে
এদিকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর আলোকে ই-রিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
মীর শাহে আলম বলেন, নীতিমালাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নগরের যানজট নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচলে শৃঙ্খলা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হলে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি সমন্বিত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের লক্ষ্যে বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
শুধু প্রশাসন বা সিটি করপোরেশনকে দায়ী না করে ঢাকার বাসিন্দাদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য, সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি নগরবাসীর সহযোগিতাও প্রয়োজন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!