দেশে আবারও উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে মিজেলস বা হাম। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ বাড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। টিকার নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৬৭৫ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৪১ জন এবং মার্চে সর্বোচ্চ ৩৫৬ জন শনাক্ত হন। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৬ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রাঙামাটি, বান্দরবান, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও গাইবান্ধায় এখনো কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮৫ জন এবং ঢাকা জেলায় ৩২ জন। রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ৫৬ জন। এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন, চট্টগ্রামে ৯৩ জন, বরিশালে ৫১ জন, খুলনায় ৫১ জন, সিলেটে ১৩ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একই সময়ে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৪। সেই তুলনায় চলতি বছরের সংক্রমণ পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেছে। তিনি বলেন, “হাম কোভিডের চেয়েও বেশি সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থার অভাব এবং পুষ্টিহীনতা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল জানান, গত তিন মাসে মৃত ২২ শিশুর বেশিরভাগের বয়স ছিল ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে। টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হওয়া এবং নিউমোনিয়া বা হৃদ্রোগসহ অন্যান্য জটিলতা থাকায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা ও চোখ লাল হওয়া। পরবর্তীতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে গালের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ দেখা গেলে তা হামের নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে টিকা সংগ্রহে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা জোরদার না করলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!