সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাইবার স্পেসে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ সোমবার সংসদে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খানের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেসব কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো আদৌ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে কি না, তা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চ্যুয়াল মিডিয়া ও অনলাইনভিত্তিক সব প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘সাইবার স্পেস’-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এআই ব্যবহার করে অপমানজনক, বিরক্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করতে নতুন বিধান আনা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কনটেন্ট অপসারণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়াকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সরকারের অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকেও তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ব্লক বা হস্তান্তরের ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও বিটিআরসিকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অনেক অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেয় না। বিদ্যমান আইনে পর্যাপ্ত বাধ্যবাধকতা না থাকাই এর অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে মেটাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশেও নতুন আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করার বিধান রাখা হবে।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক যুগের জুয়া প্রতিরোধ আইন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া, বেটিং এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনেই আইনটি উত্থাপনের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনও প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ সুবিধা, ডগ স্কোয়াড এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সক্ষমতার বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সামাজিক অনাচার, সাইবার অপরাধ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ মোকাবিলায় সরকার একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর আশা, নতুন আইন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও দায়িত্বশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!