দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আজ সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক-গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মাহদী আমিন বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদনির্ভর না হয়ে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধা, মননশীলতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার বিকাশ ঘটবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে এগিয়ে যাবে।
উপদেষ্টা জানান, শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি ক্রীড়া ও সংস্কৃতি শিক্ষা পৃথক বিষয় হিসেবে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর মধ্যেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা হবে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে দূর করা সম্ভব নয়। তবে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
নতুন কারিকুলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন বই প্রস্তুত ও ছাপার জন্য সরকারের হাতে খুব কম সময় ছিল। ফলে সব পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে আগামী বছর থেকে সংস্কার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুলসংখ্যক ট্যাব সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের মনোভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশে ‘স্টার্ট-আপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ নামে জাতীয় কর্মসূচি চালুর কথাও জানান তিনি। এ কর্মসূচির আওতায় উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের সিড ফান্ডিং দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার প্রসার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, দেশে কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে স্কিলস কম্পিটিশন, ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!