ভূমিকে শুধু উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, সুস্থ ভূমি ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বুধবার রাজধানীর পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ে বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি ভূমি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘রেইঞ্জল্যান্ড: রিকগনাইজ, রেসপেক্ট, রেস্টোর’ চারণভূমি ও প্রাকৃতিক তৃণভূমি সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক স্থলভাগ কোনো না কোনো ধরনের চারণভূমি ইকোসিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকা কোটি মানুষের জীবিকা, খাদ্যব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য, পানি চক্র এবং কার্বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ মরুভূমির দেশ না হলেও মরুময়তা, ভূমি অবক্ষয় ও খরার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার, মাটির উর্বরতা হ্রাস, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন, বন উজাড় এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমি, পার্বত্য এলাকার ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমি এবং নদী অববাহিকার ভঙ্গুর ইকোসিস্টেম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, গবেষণা অনুযায়ী দেশে মাঝারি থেকে অতি তীব্র মাত্রার ভূমি অবক্ষয়ের পরিমাণ ২০০০ সালের ১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ১ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে। গত দুই দশকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর ভূমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন, একই সময়ে খরাপ্রবণ এলাকার পরিমাণও বেড়েছে। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এলাকা খরার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভূমি ও পানি সম্পদের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব কৃষি, পানিসম্পদ ও মানুষের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের মরুকরণ মোকাবিলা কনভেনশনে (ইউএনসিসিডি) যোগ দেওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, টেকসই কৃষি, জৈব সার ব্যবহার, সংরক্ষণ কৃষি এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
খরা মোকাবিলায় বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংরক্ষণ, সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বলেও জানান তিনি।
বৈশ্বিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী ভূমি পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলা এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানে অধিকতর অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন ও জ্ঞান বিনিময়ের আহ্বান জানান।
কর্মশালায় বাংলাদেশ সরকার ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এ লক্ষ্যে অবক্ষয়প্রাপ্ত বনভূমি, জলাভূমি ও চরাঞ্চল পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিসহ গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদেরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!