জাতীয়

রেকর্ড বাজেট, ডিজিটাল হেলথ কার্ড: স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

আপডেট: জুন ২০, ২০২৬ : ০৫:৪০ এএম
রেকর্ড বাজেট, ডিজিটাল হেলথ কার্ড: স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ, সর্বজনীন ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালু, পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের মতো একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনগণমুখী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার প্রায় দ্বিগুণ। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি সহায়তা, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

পাঁচ হাজার চিকিৎসক, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী

দীর্ঘদিনের জনবল সংকট দূর করতে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই জনবল কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে নতুন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পদও সৃষ্টি করা হয়েছে।

আসছে ডিজিটাল হেলথ কার্ড

স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে চালু করা হচ্ছে ডিজিটাল হেলথ কার্ড। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি নাগরিককে এ কার্ড দেওয়া হবে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একজন রোগীর চিকিৎসা-ইতিহাস, রোগ নির্ণয়ের তথ্য ও প্রেসক্রিপশন দেখা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা কমবে।

চিকিৎসা শিক্ষায় সংস্কার

চিকিৎসা শিক্ষায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংযুক্ত আধুনিক ও দক্ষতাভিত্তিক এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও ব্যাংকঋণের সুযোগ চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা আধুনিকায়নের কাজও করা হবে।

চিকিৎসা ব্যয় কমাতে কর রেয়াত

দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হার্টের স্টেন্ট, ডায়ালাইসিস ফিল্টারসহ কয়েকটি জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর থেকে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সরকারি হিসাবে, এর ফলে হার্টের স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং ডায়ালাইসিসের প্রতি সেশনে খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমতে পারে।

পাঁচ বিভাগে শিশু হাসপাতাল

খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ২০০ শয্যার পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, আধুনিক রোগনির্ণয় সুবিধা এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে। এতে রাজধানীর বাইরে শিশুস্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি বলেন, নতুন হাসপাতালগুলো চালু হলে শিশুদের চিকিৎসার জন্য পরিবারগুলোকে ঢাকামুখী হতে হবে না। নিজ নিজ অঞ্চলে বিশেষায়িত সেবা পাওয়া যাবে।

বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো উদ্যোগগুলো স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এসব পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন ও তদারকির ওপর।

তাদের মতে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ভৌগোলিক অবস্থান বা আর্থিক সামর্থ্য নির্বিশেষে দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথে বড় অগ্রগতি হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!