জাতীয়

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

আপডেট: জুন ২২, ২০২৬ : ০৪:৩১ এএম
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রত্যাশা নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকে কেন্দ্র করে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন গতি পেতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নসহ বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার এবং বৃহত্তম আমদানির উৎস।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে মালয়েশিয়া সফরে রয়েছেন। দুই দিনের সফর শেষে আজ সোমবার রাতে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত শনিবার সাংবাদিকদের জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনার অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিব আরও জানান, সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক, চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা ও প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফরের শুরুতে দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

এরপর বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ প্রধান বক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন তিনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। তবে এ বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি বাড়ানো গেলে এ ব্যবধান কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পাশাপাশি বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (জিডিআই) আওতায়ও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তাঁর মতে, চীনা বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিখাতে আগ্রহ দেখালেও প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ আসেনি।

তিনি বলেন, চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা এবং পুঁজিবাজার উভয়ই উপকৃত হবে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

খোরশেদ আলম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষেও মত দেন। তাঁর মতে, এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেন ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

চীনা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনা ব্যবসায়ীদের আগ্রহ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে এবং নতুন বিনিয়োগের পথ সুগম করবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে—বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।


আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!