কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল রক্ষায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি বৈধ ইটভাটায় সরবরাহ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইট তৈরিতে কৃষিজমির উর্বর মাটির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি খনন করা মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে চলতি বছর একটি পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে পারে। যেসব এলাকায় খাল খনন করা হবে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের এ উদ্যোগের আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে একটি পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছি। আশা করি, এ বছর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করলেও আগামীতে এটাকে আরও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে।’
শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘টপসয়েল নষ্ট করতে দেব না—এটা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। আমাদের ফার্টাইল ল্যান্ডকে রক্ষা করতে হলে ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’
ইটভাটার মালিক সমিতির নেতাদেরও এ উদ্যোগ সম্পর্কে জানানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। ইটভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রচলিত ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় নদী ও খাল খননে বাস্তব জটিলতা থাকলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
টপসয়েল হারালে কমে জমির উৎপাদনক্ষমতা
কৃষিজমির উপরিভাগের মাটিতে জৈব পদার্থ ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান বেশি থাকে। এসব উপাদান উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ মাটি সরিয়ে নেওয়া হলে জমির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, টপসয়েল হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি। এটি সরিয়ে নেওয়া হলে জমির উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিকে আবার চাষের উপযোগী করতে অতিরিক্ত সার ও অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে টপসয়েল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ও এর নিচের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। টপসয়েল অপসারণের পর তা পুনরুদ্ধারে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে।
তিনি বলেন, টপসয়েল হারানোর ফলে কৃষি উৎপাদন ও মাটির উর্বরতা কমে যায়। অনেক জমিতে জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হতে পারে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার আরও বলেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইট ব্যবহারে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি কাজে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে টপসয়েল উত্তোলন, মাটির ক্ষয় ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।
তাঁর মতে, টপসয়েল সংরক্ষণ করা গেলে মাটি রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বায়ুদূষণ কমানোর মতো তিন ধরনের সুফল পাওয়া যাবে।
আইন থাকলেও বন্ধ হয়নি মাটি কাটা
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট হয়। এতে জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে টপসয়েল রক্ষার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে নগদ লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার মালিকদের কাছে জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করেন। এ প্রবণতা বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করা জরুরি।
আলমগীর কবির আরও বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিতে উত্তোলিত মাটি ব্যবহারের জন্য একটি কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। খনন করা মাটি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে একদিকে অপচয় কমবে, অন্যদিকে ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহারও হ্রাস পাবে।
খাল খননের মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার তাগিদ
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটিকে বৈধ ইটভাটার বিকল্প কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ কার্যকর করতে মাটির গুণাগুণ, সরবরাহব্যবস্থা ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি, খনন করা মাটি পরিবহন ও সরবরাহের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্লক ইটের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষিজমির মাটির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আইনটিতে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরিভাগের মাটি কাটার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই বিদ্যমান জমির উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একবার উর্বর মাটি সরিয়ে নিলে স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ কারণে ইট তৈরির মতো কাজে কৃষিজমির টপসয়েল ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাল খনন, বৈধ ইটভাটার তালিকা প্রণয়ন, উদ্বৃত্ত মাটির ব্যবস্থাপনা এবং ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এ কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!