সরকারি স্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) চার শতাধিক স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব স্থাপনা ও অধিদপ্তরের অব্যবহৃত জায়গায় মোট ৫ হাজার ১৪৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সওজ।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অধিদপ্তরের বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও অব্যবহৃত জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থাপনায় ৪১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
চার অর্থবছরে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ২৪৪ কিলোওয়াট, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। চার অর্থবছরে মোট ৫ হাজার ১৪৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৮৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে দরপত্র আহ্বায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৯৬০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
সওজের কর্মকর্তারা জানান, এ উদ্যোগের আওতায় শুধু ভবনের ছাদ নয়, অধিদপ্তরের অব্যবহৃত খালি জায়গাও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো হবে। এসব জায়গায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর আশা
সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে নতুন করে জমি ব্যবহারের প্রয়োজন ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে ব্যবহার করা গেলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অধিদপ্তরের যেসব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বাসসকে বলেন, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো ২০৫০ সালের নেট-জিরো জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে। এ কাজে সওজের ভূমিকা প্রশংসনীয়।
স্রেডার প্রকাশিত নীতিগত তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে সওজের মতো বড় সরকারি অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ভবন ও অব্যবহৃত জায়গা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সওজের বিভিন্ন কার্যালয় ও প্রকৌশল স্থাপনায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে দিনের বেলার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ ব্যবহার এবং গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের ওপর।
কোন স্থাপনায় কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটুকু নিজস্ব কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর ফলে কত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিরূপণ সহজ হবে।
সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অব্যবহৃত জমিতে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস ও পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!