জাতীয়

সৌর সেচে বদলাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি, কমছে উৎপাদন খরচ

আপডেট: অক্টো ১৯, ২০২৬ : ০৫:১০ এএম ৩ ০
সৌর সেচে বদলাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি, কমছে উৎপাদন খরচ

রাজশাহী বিভাগের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ডিজেল ও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে জমি ও ফলবাগানে সেচ দিচ্ছেন কৃষকেরা। এতে সেচের খরচ কমার পাশাপাশি অনাবাদি জমিতে ফসল উৎপাদন এবং পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার বাড়ছে।

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় গত দুই বছরে বিভাগের আট জেলায় ৩২টি সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব পাম্প চালুর ফলে কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যৌথ উদ্যোগে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিভাগের ৬৭টি উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, সেচের ব্যয় কমানো এবং পানির অপচয় রোধ করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত, দুর্গম ও খরাপ্রবণ এলাকায় সৌর সেচ কৃষকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে।

তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা

প্রকল্পের আওতায় তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ অশ্বশক্তির ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থায় স্থাপন করা হয়েছে ২৪টি স্থায়ী ইউনিট। নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়ার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া এক জমি থেকে অন্য জমিতে সহজে নিয়ে যাওয়ার সুবিধাসহ স্থাপন করা হয়েছে আটটি পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ইউনিট। ফলে কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন জমি ও বাগানে এসব ইউনিট ব্যবহার করতে পারছেন।

ফলবাগানে সেচের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট এক একর আয়তনের ফলবাগানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটায় ফোঁটায় সেচপ্রযুক্তি।

এ পদ্ধতিতে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া হয়। ফলে পানির অপচয় কমে, মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় বজায় থাকে এবং আগাছার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর ফলে ফলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সেচের খরচ কমায় স্বস্তিতে কৃষক

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমি ও বাগানে সেচ দিতে গিয়ে তাঁকে অনেক টাকা খরচ করতে হতো। সেচ মৌসুমে চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়াও ছিল বড় সমস্যা।

আলমগীর হোসেন বলেন, এখন সরকারি সহায়তায় সৌরশক্তি ব্যবহার করে সহজেই বাগানে সেচ দিতে পারছেন। এতে খরচ কমেছে, পানির অপচয়ও কম হচ্ছে। পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।

খরাপ্রবণ এলাকায় বাড়ছে ফসল উৎপাদনের সুযোগ

বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই খরা ও পানিসংকটের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের জন্য পানির সংস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌরশক্তিচালিত সেচের পাশাপাশি পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মাঠপর্যায়ে সৌর সেচপ্রযুক্তির কার্যকারিতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো খরাপ্রবণ ও পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড কিংবা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, গত দুই বছরে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় কমেছে। অনাবাদি ও পতিত জমিতে সেচের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনা

কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে সেচের ব্যয় ও জ্বালানি আমদানির চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সেচের পাশাপাশি পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও জরুরি। সৌরশক্তি ব্যবহার করে সেচের খরচ কমলেও পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো কঠিন হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সৌর সেচের সঙ্গে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সমন্বয় করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও সহজ হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় এ উদ্যোগ দেশের কৃষিকে আরও টেকসই করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!