জাতীয়

প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

আপডেট: অক্টো ২২, ২০২৬ : ০৫:০৯ এএম ৫ ০
প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের বিষণ্ন সুরে শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক থেকে বিদায় জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। এর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের পূজার আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে।

পূজার রীতি অনুযায়ী, বুধবার সকালে দর্পণ-বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। পরে সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের আবেগঘন পরিবেশে নদীতে একে একে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য হলো মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়া। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। পরবর্তী পাঁচ দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন ভক্তরা। বুধবার দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের উৎসব।

ঢাকায় বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা

প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের করা হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পলাশীর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন।

পরে শত শত ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, গোলাপ শাহ মাজার ও কোর্ট এলাকা ঘুরে সদরঘাটে পৌঁছায়। এ সময় সড়কের দুই পাশে উৎসুক দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।

সন্ধ্যায় ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে তুরাগ নদীতেও চলে বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা।

বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সড়কে পুলিশ ও নদীতে নৌপুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের দল।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রতিমা রাখা হলো

দেশের অধিকাংশ পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। সেখানে পূজায় ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।

প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তিজল এনে মঙ্গলঘটে রাখা হয়। আগামী বছর পূজার সময় সেই শান্তিজল ঘট থেকে প্রতিমায় নিবেদন করা হবে।

অন্যদিকে, রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যার আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন এবং মিষ্টিমুখ করেন।

সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে পূজা

এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিভিন্ন মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় পূজামণ্ডপের জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়। সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান অনেকে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বামী শিবের আবাস কৈলাসে ফিরে যান। আগামী শরতে আবারও তিনি ফিরে আসবেন ধরণীতে।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ উৎসবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!