জাতীয়

এনআইডি সংশোধনে বড় অগ্রগতি, নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখের বেশি আবেদন

আপডেট: অক্টো ২৪, ২০২৬ : ০৫:৪১ এএম ১ ০
এনআইডি সংশোধনে বড় অগ্রগতি, নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখের বেশি আবেদন

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

তবে এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে বাতিল করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন।

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির পরও নতুন আবেদন জমা পড়া, অযৌক্তিক আবেদন বাছাই এবং জালিয়াতি প্রতিরোধের বিষয়গুলো এখন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। পাশাপাশি জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে যাচাইপ্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সাল পর্যন্ত জমা পড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আবেদনগুলোর নিষ্পত্তিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ায় কিছু আবেদন অপেক্ষমাণ থাকছে।

অপেক্ষমাণ আবেদনের বড় অংশ ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে

ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৬৮ হাজার ২৬৯টি আবেদন। এ ছাড়া ২০২৫ সালের একই ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ রয়েছে ৯৮৩টি আবেদন। সব মিলিয়ে এ ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা ৬৯ হাজার ২৫২।

অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা অঞ্চলে ১০ হাজার ৬১৫টি, ফরিদপুরে ৫ হাজার ১৪০টি, খুলনায় ৫ হাজার ৮৭১টি, ময়মনসিংহে ৮ হাজার ৩৩২টি এবং রংপুরে ৪ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে।

অন্যদিকে সিলেটে ৬ হাজার ৪৬৯টি, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৮৭৫টি, বরিশালে ৪ হাজার ২২৬টি, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৬৮৮টি এবং কুমিল্লায় ১০ হাজার ৫৫৯টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে অপেক্ষমাণ আবেদনের চাপ তুলনামূলক বেশি। ফলে এসব অঞ্চলে দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তিতে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ

এনআইডি সংশোধন কার্যক্রমে গতি আনতে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আবেদন নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বাসসকে বলেন, আবেদন নিষ্পত্তির মূল লক্ষ্য হলো নির্ভুলভাবে কাজ করা। এমনভাবে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না পড়ে।

তিনি বলেন, অতীতে অযৌক্তিক আবেদনগুলো সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। এখন যুক্তিসংগত নয়—এমন আবেদন বাতিল করা হচ্ছে। প্রতিটি আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত বছর বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আখতার আহমেদ আরও বলেন, সংশোধনের জন্য জমা পড়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রে এখন আর সংশোধনের প্রয়োজন নেই। আবার বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের কিছু আবেদনে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেওয়া তথ্যের অসংগতিও পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

জন্মতারিখ সংশোধনে বাড়তি নজরদারি

এনআইডিতে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষাসনদের ভিত্তিতে আবেদন নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

এ বিষয়ে সম্প্রতি সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছে ইসি। গত ১৩ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষাসনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ প্রযোজ্য হবে না।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ছাড়া দৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রত্যেক নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার অন্তত তিনটি আবেদন যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

গত ১৩ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদন ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসের প্রতিবেদন পরের মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।

এর মাধ্যমে জন্মতারিখ সংশোধনের সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়াতে চায় কমিশন।

বয়সের অসংগতিতে বাতিল হচ্ছে আবেদন

এনআইডি সংশোধনের অপেক্ষমাণ আবেদন ও বাতিলের কারণ ব্যাখ্যা করে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, অনেক আবেদন সংশোধনযোগ্য নয়। বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে কখনো দেখা যায়, বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র ১০ বছর। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনের পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভোটার হওয়ার সময় বয়স ১৮ বছরের কম ছিল। এ ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল করা হয়।

সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনো আবেদন একটি ক্যাটাগরিতে বাতিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য ক্যাটাগরিতে আবার আবেদন করেন। এতে একই ধরনের আবেদনের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফলে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা বেশি বলে মনে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অপেক্ষমাণ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠিও পাঠানো হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ ও সেবার মানসিকতার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকিও আবেদন নিষ্পত্তির অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।

জালিয়াতি ঠেকাতে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ

এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি প্রতিরোধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে। কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।

তিনি বলেন, জালিয়াতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, জালিয়াতির ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।

ইসি সচিবের আশা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা গেলে এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতির ঘটনা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এদিকে প্রতারক চক্রের প্রলোভনে না পড়তে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছে এনআইডি বিভাগ। এ বিষয়ে হেল্পডেস্ক থেকেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম।

নির্ভুল নিবন্ধনে গুরুত্ব

প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ার কারণে শুধু নিষ্পত্তির গতি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। নিবন্ধনের সময় তথ্য যাচাই জোরদার করা, আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা এবং সংশোধনপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

৬৪ লাখের বেশি আবেদন নিষ্পত্তির পর এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবশিষ্ট আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন কমিয়ে আনা। নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে নাগরিকদের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি প্রতিরোধও সহজ হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!