জাতীয়

চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, আলোচনায় বিনিয়োগ ও মেট্রোরেল

আপডেট: অক্টো ২৫, ২০২৬ : ০৪:৫৭ এএম ১ ০
চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, আলোচনায় বিনিয়োগ ও মেট্রোরেল

জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের হার কমানো, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামীকাল ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে অবস্থান করবেন তারেক রহমান। সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক, জাপানের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।

এ ছাড়া জাপানের শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হবে।

মেট্রোরেল ও ঋণের সুদ কমানোর আলোচনা

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বাংলাদেশের চলমান অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা। বিশেষ করে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার হ্রাসের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

এ ছাড়া অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তিনি।

শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজ

জাপানের সঙ্গে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত প্যাকেজের কয়েকটি উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিআইজি-বি উদ্যোগের আওতাভুক্ত।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ীসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন ও ইলেকট্রনিকস খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সফরে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে এসব খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক

সফরের তৃতীয় দিন ২৮ অক্টোবর জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর জাপানের তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।

একই দিন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তারেক রহমান। এ ছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন এবং জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর। জাপানের আরও ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি দলীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।

বিকেলে টোকিওতে জেট্রোর ভবনে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ফোরামে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহন, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হবে।

এসব খাতে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে পৃথকভাবে আরও কয়েকটি সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের কর্মসূচি রয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বিবেচনায় কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও গবেষণার মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।

জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা পরিদর্শন

সফরের দ্বিতীয় দিন জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।

সফরের শেষ দিন ২৯ অক্টোবর টোকিও থেকে শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে নাগোয়া যাবেন তারেক রহমান। সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করবেন তিনি। এ ছাড়া টয়োটা সুসো করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোশিমিতসু ইমাইয়ের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন।

উন্নয়ন সহযোগিতায় দীর্ঘদিনের অংশীদার জাপান

স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পে দেশটির সহযোগিতা রয়েছে।

গত ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপান সরকার প্রধানমন্ত্রীর সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। সফরে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা জাপান যাবেন।

সফরসূচি অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আজ রাতে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে তাঁর টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা তাঁকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে তিনি টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অবস্থান করবেন।

সফর শেষে বৃহস্পতিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!